সুমনদার গাড়িতে একসাথে ফেরার পথে !

60 / 100

ছেলেটার সাত বছরের রিলেশন ছিলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটা আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। নাম মোহনা।

তোর বউয়ের তো ৭মাস চলছে

Love story of a single mother

সংসারের চোখ রাঙানি এড়িয়ে এ এক অদ্ভুত ভালোবাসা

সন্তানের মা হলে কি ভালোবাসা বারণ ?

দাদাটার নাম ছিলো সুমন। আমাদের হোস্টেলই থাকত। দু ব্যাচ সিনিয়র। কোনদিনও হাসি ছাড়া দেখিনি ওকে। এতো ভদ্র ছেলে পুরো ক্যাম্পাসে পাওয়া দুষ্কর ছিল। মেয়েটাকে ভালোও বাসতো পাগলের মতো। প্রায়ই দেখা যেতো ক্যাম্পাসে হাতে হাত রেখে হেটে চলেছে দুজনে। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই অবশ্য হাত ছেড়ে দিয়ে লাজুক হাসি দিত সুমনদা,মাঝে মাঝেই রাত তিনটা-চারটায় ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, হোস্টেল এর করিডোরের এক কোনায় দাড়িয়ে সুমনদা তখনও গুজুর গুজুর করেই চলেছে

একটা চাকরির অভাবে সেই সম্পর্কটাই বদলে গেল কী ভীষনভাবে!ততোদিনে দাদার মাস্টার্স পাস করা শেষ। চাকরি পাচ্ছে না বলে হোস্টেলে থেকে গিয়েছিল আরও দেড় বছরের মতো।মেয়েটা ছেড়ে চলে গিয়েছিলো মাস্টার্স শেষের এক বছরের মাথায়। যাবেই না বা কেনো, সুন্দরী মেয়ে, বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, সেই ছেলে আবার WBCS অফিসার ।→যাওয়ার আগে মেয়ে বলে গিয়েছিলো, “চাকরি পাও না, যোগ্যতা নেই, তো প্রেম করতে এসেছিলে কেন?”

sutapa-halder-p-22

ব্রেকাপের পর সুমনদা প্রায়ই আমার রুমে আসত, সিগারেট খেতে। হাতে সবসময় কোনো না কোনো WBCS এর বই থাকতোই। ঘন্টার পর ঘন্টা ধোঁয়া ছাড়ত, আর মাথে মাঝে ওর জীবনের গল্প বলে চলত। বাড়ির রান্নাঘরের কোনাটা ভেঙে পড়েছে, বড় বোনটার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে, বাপের আবার পেনশন গেছে এই বছর। মাঝে মাঝে কথা বলা বন্ধ করে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকত। কি যেন ভাবত। হয়তো সে ভাবনা আমাদের ধরাছোয়ার বাইরে!

মাস্টার্সের দেড় বছরের মাথায় সুমনদা কে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো। বের করে দিয়েছিলো তারাই, যারা সুমনদার হেল্প পেতে পেতে এতদূর এসেছে, যাদের হোস্টেলে ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলো সুমনদা নিজেই।

sutapa-halder-p-46

যেদিন বেরিয়ে যায়, অঝোর ধারায় চোখ থেকে জল পড়ছিলো। ভার্সিটিতে ক্লাস সেরে এসে দেখি, সুমনদা বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাকে দেখে চোখে জল নিয়ে অনেক কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বলেছিল, “আর যাই করিস, প্রেম করতে যাস না ভাই। জীবনটা ছাই বানিয়ে দেবে। ” কথাটা কাগজে লিখে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছিলাম!

উপরের কথাগুলো প্রায় বছর-দশক আগের।জমি সংক্রান্ত একটা কাজে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম কোনো এক রেভিনিউ অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে, বিষেশত বর্ধমান ইউনিভার্সিটির কোনো বড় দাদার সাথে। হেল্প বেশি পাওয়া যায় তাহলে।খোজ-খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হলো। সুমনদা এখন পুরুলিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের নামী A গ্রেড অফিসার!!

sutapa-halder-p-03
sutapa-halder

সময় করে একদিন গেলাম সুমনদার অফিসে। ঝা চকচকে টেবিলের একপাশে বসে ছিলো সুমনদা, আমাকে দেখে বিশাল এক হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। একথা সেকথার পর উঠল সংসার জীবনের কথা, বললাম, বিয়ে-থা করিনি এখনো, যাযাবর জীবনই ভালো লাগছে। দাদার কথা জিজ্ঞেস করতে বলল, বিয়ে করেছে, একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে। বৌদি আবার কলকাতা মেডিকেলের ডাক্তার।

অনেকক্ষন যাবত মনের মধ্যে একটা কথা বাজছিল, শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “মোহনার কথা মনে পড়েনা, সুমনদা ” বেশ বড়সড় একটা হাসি হেঁসে বলল, “না রে। জীবনে যা চেয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে গিয়েছি। এখন আর এইসব ছোটখাট চাওয়াগুলো পাত্তা পায়না।”

sutapa-halder-p-27

জিজ্ঞেস করলাম, “মোহনার আর কোনো খবর পাওনি ? ” কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল, “শুনেছিলাম বছরখানেক আগে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এরপর আর কোনো খবর পাইনি। “

সুমনদার গাড়িতে একসাথে ফেরার পথে দাদার বলা একটা কথা প্রায়ই কানে বাজে, “লাইফে কাউকে ঠকাস না রে। লাইফ কাউকে ছাড় দেয়না, প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ে। রিভেঞ্জ অফ নেচার! “

সত্যিই, লাইফ কি ভীষনভাবে রং পাল্টায় !

Leave a Comment